
আরিফ খাঁনঃ পাবনার এক সময়ের চরমপন্থি অধ্যুষিত এলাকাগুলোতে নতুন করে নিষিদ্ধ ঘোষিত চরমপন্থিদের তৎপরতা শুরু হয়েছে। সম্প্রতি, এসব এলাকায় নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠন পূর্ববাংলার কমিউনিস্ট পার্টির (এমএল-লাল পতাকা) প্রকাশ্যে দেয়াল লিখন ও পোস্টার দেখা গেছে। একই সাথে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে কয়েকটি বড় অস্ত্র ও গোলাবারুদের চালান উদ্ধার ও গ্রেফতারকৃত আসামীদের সাথে পাবনা অঞ্চলের চরমপন্থি সংগঠনের কানেকাশনের কথা জানিয়েছে র্যাব।
দীর্ঘ এক দশক পরে হঠাৎ চরমপন্থি তৎপরতা বেড়ে যাওয়ায় স্থানীয়দের মাঝে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। স্থানীয়রা জানান, গত শনিবার (২১ মার্চ) ঈদের দিন রাতে সাঁথিয়া উপজেলার আতাইকুলা থানা এলাকাসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠন পূর্ববাংলার কমিউনিস্ট পার্টির (এমএল-লাল পতাকা) নামে পোস্টার সাঁটানো হয়। প্রায় এক দশকেরও বেশি সময় পর নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠন পূর্ববাংলার কমিউনিস্ট পার্টির (এমএল-লাল পতাকা) পোস্টারে সর্বহারার সমাজতন্ত্র কায়েমের পাশাপাশি স্থানীয় তাঁত শিল্প রক্ষার কথা বলা হয়েছে। দীর্ঘদিন নীরব থাকার পর এ ধরনের তৎপরতা চরমপন্থি সংগঠনের পুনরুত্থানের ইঙ্গিত দিচ্ছে বলে মনে করছেন স্থানীয় লোকজন। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, রোববার (২২ মার্চ) সকাল থেকে আটঘরিয়া, ফরিদপুর, সাঁথিয়া এলাকার একদন্ত, লক্ষ্মীপুর, বৃহস্পতিপুর, ভুলবাড়িয়া, তেবাড়িয়া, শ্রীপুর, শিবপুর, শরৎগঞ্জ, ধানুয়াটা, বালুঘাটা, আয়েনগঞ্জ, হাদল, ধূলাউরীসহ বিভিন্ন বাজারে এ পোস্টার দেখা গেছে।
সরেজমিনে আতাইকুলা থানা এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, থানা এলাকার বিভিন্ন দোকান, দেয়াল ও জনসমাগমস্থলে লাল রঙের এসব পোস্টার সাঁটানো। পোস্টারে দুনিয়ার সর্বহারা এক হও’ স্লোগানের পাশাপাশি সাম্যবাদী আদর্শ প্রচারের বিভিন্ন বার্তা দেওয়া হয়েছে। এতে কার্ল মার্কস, ফ্রিডরিখ এঙ্গেলস, ভ্লাদিমির লেনিন, জোসেফ স্ট্যালিন এবং মাও সেতুংয়ের ছবি ব্যবহার করা হয়েছে। পোস্টারগুলোতে লেখা রয়েছে, বন্দুকের নল থেকে রাজনৈতিক ক্ষমতা বেরিয়ে আসে, ভোটের বাক্সে লাথি মারো সমাজতন্ত্র কায়েম করো, লাঙ্গল যার জমি তার, জাল যার জলা তার, বিদেশি কাপড় বন্ধ করো, তাঁত শিল্প রক্ষা করো, রং সুতার অবৈধ ব্যবসা বন্ধ করো, করতে হবে। পোস্টারের নিচে পূর্ববাংলার কমিউনিস্ট পার্টির (এমএল-লাল পতাকা) নাম উল্লেখ রয়েছে।
স্থানীয় ব্যবসায়ীরা বলেন, রাতের আঁধারে এসব পোস্টার লাগানো হয়েছে। সকালে উঠে এগুলো দেখার পর থেকেই এলাকায় থমথমে অবস্থা বিরাজ করছে। পুরোনো রক্তক্ষয়ের দিনের কথা মনে করে তারা আতঙ্কিত।
২০১৯ সালে আত্ম সমর্পণ করে স্বাভাবিক জীবনে ফেরা বেড়া উপজেলার এক চরমপন্থি নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, আইন শৃংখলা বাহিনীর কঠোর অবস্থানের কারণে গত এক দশকে চরমপন্থি দলগুলোর কার্যক্রম স্থিমিত হয়ে পড়ে। অনেকেই ভুল বুঝতে পেরে সরকারের দেয়া সুযোগ কাজে লাগিয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসে। যারা আত্মসমর্পণ করেনি তারাও তৎপরতা কমিয়ে আড়ালে চলে যায়। কিন্তু ৫ আগস্টের পর এসব লোকেরা বিএনপির সাথে মিশে যাওয়ার চেষ্টা করে। যেখানে সুযোগ পেয়েছে সেখানেই বালুমহাল, হাট ও বাজার, ব্যবসার নিয়ন্ত্রণের কাজে জড়িয়ে পড়েছে। এরা স্বাভাবিক জীবনে ফেরা চরমপন্থিদেরও শ্রেণী শত্রু ট্যাগ দিয়ে নিধনের তালিকা করেছে। আমিও কয়েকবার হামলার শিকার হয়ে কোন মতে বেঁচে ফিরেছি। তার গোপনে পুনর্গঠনের চেষ্টা করছে। এদের এখনই নিয়ন্ত্রণ না করলে ভবিষ্যতে তা মারাত্মক রূপ নিতে পারে।
নিষিদ্ধ সংগঠনটির এক কর্মী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘পুঁজিবাদী সব্যাবস্থায় বর্তমান রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বৈষম্যের কারণেই তারা আবারও সক্রিয় হওয়ার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করছেন।’
তবে বিষয়টিকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা উল্লেখ করে আতাইকুলা থানার ওসি জামিরুল ইসলাম জানান, পোস্টারিংয়ের খবর পাওয়ার পর আমি থানা পুলিশ নিয়ে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছি। নমুনা সংগ্রহ করেছি। আমরা বিষয়টি খতিয়ে দেখছি। এলাকায় তাদের প্রকাশ্য তৎপরতা নেই। এরপরেও, সাধারণ মানুষের জানমালের নিরাপত্তা বিঘ্ন করার অপতৎপরতা কঠোর ভাবে দমন করা হবে। তিনি আরও বলেন, স্থানীয় জনগণ সন্ত্রাসী কর্মকান্ড দেখতে চান না। নিষিদ্ধ সংগঠনের সদস্যদের সম্পর্কে কারও কাছে সুনির্দিষ্ট তথ্য থাকলে পুলিশকে দিয়ে সহযোগিতা করার অনুরোধ করছি। এছাড়াও সব পোস্টার ছিরে ফেলা হয়েছে বলে তিনি জানান।
এদিকে গত ১০ মার্চ ঢাকায় র্যাব পাবনার রকিব রানা ও শুট্যার আলমগীর নামের দুজন অস্ত্র ব্যবসায়ীকে অস্ত্রের বড় চালানসহ গ্রেফতারের পর সংবাদ সম্মেলনে জানায়, অভ্যুত্থান-পরবর্তী দেশের উত্তর ও পশ্চিমাঞ্চলের চরমপন্থি সংগঠনগুলো আবারও সক্রিয় হওয়ার চেষ্টা করছে বলে জানিয়েছে র্যাব। সংস্থাটি বলছে, আত্মসমর্পণ করা অনেক চরমপন্থি সদস্য নতুন করে অপরাধমূলক কর্মকান্ডে সক্রিয় হয়ে উঠছে।
র্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক উইং কমান্ডার এম জেড এম ইন্তেখাব চৌধুরী বলেন, গ্রেপ্তারকৃতরা প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে জানিয়েছে এসব অস্ত্র চট্টগ্রাম এলাকা থেকে ঢাকায় আনা হয়েছে। পরে সেগুলো পাবনায় নেওয়ার পরিকল্পনা ছিল। পাবনা ও কুষ্টিয়া অঞ্চলে চর দখল নিয়ে বালুমহালে আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন চরমপন্থি গ্রুপের মধ্যে সংঘর্ষ ও সন্ত্রাসী কর্মকান্ড হয়ে থাকে। এসব অস্ত্র এ অঞ্চলের বালুমহালে আধিপত্য বিস্তারে ব্যবহারের আশঙ্কা রয়েছে। আগে আত্মসমর্পণকারী অনেক চরমপন্থি ফের অপরাধমূলক কর্মকান্ডে জড়িয়ে পড়ছে।
পাবনা র্যাবের কোম্পানি কমান্ডার লেফটেন্যান্ট ওয়াহিদুজ্জামান জানান, ‘এর আগে পাবনাতে চরমপন্থি দলের মোট ১৭৫ জন সদস্য র্যাবের কাছে অস্ত্রশস্ত্র জমা নিয়ে আত্মসমর্পণ করেছিলো। তারা স্বাভাবিক জীবনযাপন করছে। এর বাইরেও কিন্তু অনেক চরমপন্থি সদস্য রয়েছে। যারা বিভিন্নভাবে বিভিন্ন সময় আত্মগোপনে ছিলো। এখন তারা একটু সুযোগ পেলে নিজেদের অবস্থান জানান দেবার চেষ্টা করছে কখনো কখনো। ঈদে পোস্টারিং এর ঘটনা তেমনই একটা বিষয়। তবে এটি মানুষের জন্য কোনো আতঙ্কের বিষয় নয়। আমরা নিয়মিতই অভিযান চালাচ্ছি। অনেককেই অস্ত্র সহ গ্রেফতার করছি। এধরণের কর্মকান্ড করে পূর্বের মত কোনো সহিংসতা চরমপন্থি সদস্যরা ঘটাতে পারবে না। এক্ষেত্রে আমরা আমাদের তৎপরতা আরো বৃদ্ধি করছি বলে তিনি জানান।’