
আরিফ খাঁনঃ দলীয় কোন্দল, বহিষ্কার, সীমানা পুনর্বিন্যাস নিয়ে আদালত পর্যন্ত গড়ানো আইনি লড়াই, নির্বাচন স্থগিত ও পুনরায় তফসিল ঘোষণা, মনোনয়ন ঘিরে গুঞ্জন- সবকিছু মিলিয়ে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে পাবনা-১ আসনের রাজনীতি ছিল টানা নাটকীয়তায় ভরা। সেই দীর্ঘ নাটকের শেষ দৃশ্যে এসে দেখা যাচ্ছে, একসময় যাঁকে ঘিরে বিভক্ত ছিল বিএনপি, সেই মো. শামসুর রহমানের পক্ষেই এখন এককাট্টা দল, সাবেক প্রতিদ্বন্দ্বী এবং প্রভাবশালী রাজনৈতিক অংশ।
বর্তমানে পাবনা-১ আসন গঠিত শুধু সাঁথিয়া উপজেলা নিয়ে। সাঁথিয়ার রাজনীতিতে দীর্ঘদিনের ত্যাগী নেতা হিসেবে পরিচিত শামসুর রহমানকেই এ আসনে এবার বিএনপি দলীয় মনোনয়ন দিয়েছে। তবে এই মনোনয়নের পথে যেতে গিয়ে বিএনপিকে পার হতে হয়েছে দীর্ঘ ও জটিল রাজনৈতিক সংকট।
কমিটি গঠন থেকে সংঘর্ষ : ২০২৪ সালের নভেম্বরে সাঁথিয়া উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটি গঠনকে কেন্দ্র করেই দ্বন্দ্বের শুরু। ওই কমিটিতে খায়রুন নাহার খানম মীরুকে আহ্বায়ক ও সালাউদ্দিন খানকে সদস্যসচিব করা হয়। শামসুর রহমান ও তাঁর সমর্থকদের প্রত্যাশা ছিল, তাঁকেই আহ্বায়ক অথবা সদস্যসচিব করা হবে। কিন্তু তাঁকে জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক করায় ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে।
এই সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে শামসুর রহমানের সমর্থকেরা রাজপথে নামলে একাধিক দফায় সংঘর্ষ হয়। সালাউদ্দিন খান ও শামসুর রহমানপন্থীদের মধ্যে সংঘর্ষে উভয় পক্ষের বহু নেতা-কর্মী আহত হন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগে শামসুর রহমানকে বিএনপি থেকে বহিষ্কার করা হয়।
সীমানা পুনর্বিন্যাস ও নির্বাচন স্থগিত : এর মধ্যেই নির্বাচন কমিশন পাবনা-১ ও পাবনা-২ আসনের সীমানা পুনর্বিন্যাস করে। নতুন প্রজ্ঞাপনে শুধু সাঁথিয়াকে পাবনা-১ এবং বেড়া ও সুজানগরকে পাবনা-২ আসন ঘোষণা করা হয়। এতে বেড়াবাসীর মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। হরতাল, মহাসড়ক অবরোধসহ নানা কর্মসূচি পালিত হয়।
বিষয়টি গড়ায় আদালতে। হাইকোর্ট প্রথমে পুনর্বিন্যাস বাতিল করলেও আপিল বিভাগ নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্ত বহাল রাখেন। এই আইনি জটিলতার ধারাবাহিকতায় গত ৬ জানুয়ারি নির্বাচন কমিশন পাবনা-১ ও ২ আসনের ভোট স্থগিত করে। পরে আপিল বিভাগের নির্দেশে সেই সিদ্ধান্ত স্থগিত হয় এবং গত বছরের ৪ সেপ্টেম্বরের গেজেট অনুযায়ী আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি ভোট গ্রহণের দিন চূড়ান্ত করা হয়।
প্রার্থী ঘোষণা না হওয়ায় গুঞ্জন : এই টানাপোড়েনের মধ্যেই বিএনপি সারা দেশে ২৩৭টি আসনে প্রার্থীর নাম ঘোষণা করলেও পাবনা-১ আসনে নাম ঘোষণা করেনি। এতে গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়ে, সাবেক আওয়ামী লীগ প্রতিমন্ত্রী ও সংসদ সদস্য অধ্যাপক আবু সাইয়িদকে বিএনপির জোট থেকে মনোনয়ন দেওয়া হতে পারে।
আবু সাইয়িদ একসময় পাবনা-১ আসনের আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী নেতা ছিলেন। তবে সংস্কারপন্থী অভিযোগে আওয়ামী লীগ থেকে বাদ পড়ার পর তিনি ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালে আওয়ামী লীগের প্রার্থীর বিপক্ষে প্রার্থী হয়ে লড়াই করেন। ২০১৮ সালে তিনি বিএনপি জোটের প্রার্থী হয়ে ধানের শীষ প্রতীকেও নির্বাচন করেছিলেন।
বহিষ্কার প্রত্যাহার ও চূড়ান্ত মনোনয়ন : মনোনয়নপত্র দাখিলের আগে এসে বিএনপি শামসুর রহমানের বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহার করে তাঁকেই পাবনা-১ আসনে দলীয় মনোনয়ন দেয়। এই আসনে বিএনপির মনোনয়ন প্রত্যাশা করেছিলেন উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক খায়রুন নাহার খানম মীরু, সদস্যসচিব সালাউদ্দিন খানসহ সাত থেকে আটজন নেতা।
তাঁদের অনেকেই মনোনয়নপত্র দাখিল করলেও শেষ পর্যন্ত সবাই তা প্রত্যাহার করেন অথবা প্রকাশ্যে শামসুর রহমানের পক্ষে অবস্থান নেন। একসময় যাঁরা তাঁর বিরোধিতায় ছিলেন, তাঁরাই এখন মাঠে নেমে কাজ করছেন বিএনপি প্রার্থীর পক্ষে।
আবু সাইয়িদের যোগদান ও নতুন উত্তেজনা : নতুন তফসিল ঘোষণার পর আবু সাইয়িদ স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে মনোনয়নপত্র দাখিল করেন। গত ২১ জানুয়ারি তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে বিএনপিতে যোগ দিলে আবারও গুঞ্জন ছড়ায়, শামসুর রহমানকে সরিয়ে তাঁকেই মনোনয়ন দেওয়া হতে পারে। তবে ২৬ জানুয়ারি মনোনয়ন প্রত্যাহারের শেষ দিনের আগেই আবু সাইয়িদ মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার করে শামসুর রহমানের পক্ষে কাজ করার ঘোষণা দেন। তিনি প্রকাশ্যে বলেন, জামায়াত প্রার্থী ও প্রয়াত জামায়াত আমির মতিউর রহমান নিজামীর ছেলে মোহাম্মদ নাজিবুর রহমানের বিরুদ্ধে বিএনপি প্রার্থীকে বিজয়ী করতে তিনি সর্বশক্তি নিয়ে মাঠে নামবেন।
জামায়াতের ক্ষোভ ও পাল্টাপাল্টি বক্তব্য : আবু সাইয়িদের এই অবস্থানকে কেন্দ্র করে পাবনা-১ আসনে বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যে কথার লড়াই আরও তীব্র হয়। প্রতীক বরাদ্দের পর থেকেই নির্বাচনী মাঠে উত্তেজনা বাড়তে থাকে।
নিজ দলীয় প্রতীক ‘দাঁড়িপাল্লা’ বুঝে নিয়ে জামায়াত প্রার্থী মোহাম্মদ নাজিবুর রহমান অভিযোগ করেন, অধ্যাপক আবু সাইয়িদকে দলে নিয়ে বিএনপি ফ্যাসিবাদ পুনঃপ্রতিষ্ঠার ষড়যন্ত্র করছে। তিনি বলেন, সীমানা জটিলতার নামে নির্বাচন বানচালের চক্রান্তের অবসান হলেও ষড়যন্ত্র থেমে নেই। তাঁর দাবি, আগামীতে মোটরসাইকেল শোভাযাত্রায় আবু সাইয়িদকে সংবর্ধনা দেওয়ার পরিকল্পনা গণমানুষের সঙ্গে প্রতারণা। এ বিষয়ে প্রশাসন ব্যবস্থা না নিলে জনরোষ সৃষ্টি হলে তার দায় প্রশাসনকেই নিতে হবে বলেও হুঁশিয়ারি দেন তিনি।
এর পাল্টা বক্তব্যে বিএনপি প্রার্থী শামসুর রহমান অভিযোগগুলো নাকচ করে দেন। তিনি বলেন, অধ্যাপক আবু সাইয়িদ ফ্যাসিবাদী নন। তিনি দীর্ঘদিন ফ্যাসিবাদী দল থেকে দূরে ছিলেন এবং ধানের শীষ প্রতীকে নির্বাচনও করেছেন। একটি সাংগঠনিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই তিনি বিএনপিতে যোগ দিয়েছেন। তাঁকে এলাকায় ঢুকতে দেওয়া হবে না- এমন হুমকি দুঃসাহসিক। তাঁর যোগদানে বিএনপি আরও শক্তিশালী হয়েছে। জামায়াত নানা চক্রান্ত করলেও জনগণকে সঙ্গে নিয়েই বিএনপি বিজয় অর্জন করবে বলেও মন্তব্য করেন শামসুর রহমান।
প্রার্থী তালিকা ও প্রচারণা শুরু : গত ২৭ জানুয়ারি প্রতীক বরাদ্দের পর পাবনা-১ আসনে চূড়ান্ত চারজন প্রার্থী রয়েছেন। তাঁরা হলেন বিএনপির মো. শামসুর রহমান, জামায়াতে ইসলামীর মোহাম্মদ নাজিবুর রহমান, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মো. আব্দুল গণি এবং স্বতন্ত্র প্রার্থী মো. তাজুল ইসলাম।
দেশের অন্যান্য এলাকায় মূল তফসিল অনুযায়ী গত ২২ জানুয়ারি আনুষ্ঠানিক প্রচারণা শুরু হলেও সীমানা জটিলতা ও নির্বাচন স্থগিত থাকায় পাবনা-১ ও পাবনা-২ আসনে তা সম্ভব হয়নি। নতুন তফসিল ঘোষণার পর ২৮ জানুয়ারি থেকে এই দুই আসনে আনুষ্ঠানিকভাবে নির্বাচনী প্রচারণা শুরু হয়েছে।
সামনে কঠিন লড়াই : রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, চারজন প্রার্থী থাকলেও মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে বিএনপির শামসুর রহমান ও জামায়াতের মোহাম্মদ নাজিবুর রহমানের মধ্যে। দীর্ঘ নাটকীয়তার পর বিএনপি, সাবেক বিরোধী পক্ষ এবং আবু সাইয়িদের সমর্থকদের একাট্টা অবস্থান শামসুর রহমানকে বাড়তি শক্তি দিচ্ছে। তবে এর পাশাপাশি জামায়াতের শক্ত ভিত্তি ও মাঠের উত্তেজনা নির্বাচনী পরিস্থিতিকে কতটা প্রভাবিত করবে, তা নির্ধারিত হবে আগামী ১২ ফেব্রুয়ারির ভোটে।