মনসুর আলম খোকনঃ ১৯৭২ সালের ২২ জানুয়ারি মওলানা ভাসানী স্বদেশে প্রত্যাবর্তন করেন।মুক্তিযুদ্ধের সময় দীর্ঘদিন ভারতে থাকার পর এদিন স্বদেশে ফেরেন তিনি। আগামীকাল বৃহস্পতিবার তাঁর ৫৪ তম স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবস। দিবসটি উপলক্ষে ভাসানীর নিজ গ্রাম টাঙ্গাইলের সন্তোষে ভাসানী পরিষদ কর্মসূচি নিয়েছে।
১৮৮০ সালের ১২ ডিসেম্বর সিরাজগঞ্জ জেলার ধানগড়া গ্রামে জন্মেছিলেন ভাসানী।
শৈশবে পিতামাতা হারানো আবদুল হামিদ খান ভাসানী প্রাতিষ্ঠানিক পড়াশোনার কড়াকড়ি পছন্দ করতেন না। ১৯০৭ সাল থেকে দুই বছর তিনি দেওবন্দ মাদ্রাসায় লেখাপড়া করেন। কিন্তু সেখানে বিদ্যাশিক্ষার চেয়ে সাম্রাজ্যবাদবিরোধী সংগ্রামী রাজনৈতিক চেতনায় বেশি দীক্ষা গ্রহণ করেন তিনি।
১৯০৯ সালে টাঙ্গাইলের কাগমারি প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষক হিসেবে তাঁর কর্মজীবন শুরু হয়। চিত্তরঞ্জন দাশের সাহচর্যে প্রত্যক্ষ রাজনীতিতে তিনি প্রবেশ করেন ১৯১৭ সালে তাঁর জাতীয়তাবাদী দলে যোগদানের মাধ্যমে। ১৯১৯ সালে কংগ্রেসের প্রাথমিক সদস্য হন তিনি। আসামের ধুবড়ী জেলার ভাসানচরে তিনি এক বিশাল কৃষক সম্মেলন আয়োজন করেছিলেন। এরপর লোকমুখে তিনি ‘ভাসানচরের মওলানা’ বা ‘ভাসানীর মওলানা’ হিসেবে পরিচিত হয়ে ওঠেন। পরবর্তীকালে ‘ভাসানী’ শব্দটি তাঁর নামের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে যুক্ত হয়ে যায়।
মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী আওয়ামী মুসলিম লীগের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি এবং পরপর চারটার্ম দলটির সভাপতি নির্বাচিত হয়েছিলেন। ১৯৫৪ সালের জাতীয় পরিষদ নির্বাচনে তিনি যুক্তফ্রন্টের অন্যতম প্রধান নেতা ছিলেন। পরবর্তীতে আওয়ামী লীগ থেকে বের হয়ে এসে তিনি ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (ন্যাপ) প্রতিষ্ঠা করেন। মশিউর রহমান জাদু মিয়া ন্যাপের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন।
মওলানা ভাসানী তাঁর দীর্ঘ ৬৮ বছরের রাজনৈতিক জীবনে কখনো অন্যায়ের সাথে আপোষ করেননি। বারবার কারাবরণ করেছেন। কৃষক,মজুর,শ্রমিক,মেহনতি মানুষের পক্ষ নিয়ে তিনি আজীবন সংগ্রাম করে গেছেন।
কখনো তাঁকে ক্ষমতার লোভ স্পর্শ করতে পারেনি। তিনি আজীবন অত্যাচারী জমিদার ও স্বৈরাচারী শাসকবর্গের বিরুদ্ধে আন্দোলন করে গেছেন। এজন্য তাঁকে অনেক হয়রানির শিকার হতে হয়েছে। দেশ ছেড়ে চলে যেতে হয়েছে। তবে তিনি যেখানে গেছেন সেখান থেকেই নেতৃত্ব দিয়েছেন। বিপুল জনসমর্থন পেয়েছেন।
মওলানা ভাসানী শুধু রাজনীতিবিদই ছিলেন না। তিনি ছিলেন একজন প্রখ্যাত আলেম,প্রখ্যাত পীর। টাঙ্গাইলের সন্তোষে প্রতিবছর তাঁর বাড়িতে ওরস বসতো। তাঁর অনেক মুরিদ,ভক্তরা সেখানে জমায়েত হতেন। তিনি অসাম্প্রদায়িক চেতনার মানুষ ছিলেন। কখনো ধর্ম ব্যবসা করতেন না।
ভারত উপমহাদেশে তাঁর সমকক্ষ রাজনীতিবিদ মহাত্মা গান্ধী ছাড়া আর কেউ নেই। পরিতাপের বিষয় বাংলাদেশে মওলানা ভাসানীচর্চা নেই বললেই চলে। ভাসানীচর্চা রাষ্ট্রীয়ভাবে হওয়া দরকার। ভাসানীর জীবনাদর্শ সর্বত্র পৌঁছে দেয়া দরকার।
১৯৭৬ সালের ১৭ নভেম্বর তিনি মারা যান ঢাকায়। তাঁকে সমাহিত করা হয় টাঙ্গাইলের সন্তোষে।
লেখক: শিক্ষক ও সাংবাদিক।